📞 01711183631 🚚 সারা দেশে ক্যাশ অন ডেলিভারি

একটু পড়ে দেখুন

বন- বনানীর নীরবে নিভৃতে ক্রন্দন

বন- বনানীর নীরবে নিভৃতে ক্রন্দন

by মোঃ গোলাম হাবিব

Category: Research ( Professional)

TK850 TK680
  • প্রধানত বন সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়াবলির অল্প কিয়দংশ নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে

  • পুস্তকখানা রচিত হয়েছে। বন ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলির বিশালত্বের তুলনায়
  • পুস্তকে বর্ণিত ঘটনাবলি সংক্ষিপ্ত।

     

    পুস্তকখানা রচনায় যাঁরা আমাকে সাহায্য করেছেন, তাদের সবাইকেই জানাই কৃতজ্ঞতা-সহ

  • আন্তরিক ধন্যবাদ।

     

    ইন্টারনেট থেকে তথ্য সংগ্রহে আমাকে সাহায্য করেছে আমার নাতি (ভাতিজার পুত্র)

  • তওশিফ ইকবাল অনন্ত। তাকে ধন্যবাদ জানাই। ধৈর্য-সহকারে পুস্তকখানার কম্পিউটার কম্পোজ
  • করেছেন মোঃ মনজুরুল ইসলাম সাগর। তার কাজের প্রশংসা করার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা
  • জ্ঞাপন করি এবং তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।

     

    আমি কৃতজ্ঞ আমার সহকর্মীবৃন্দের প্রতি। বন ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের কাজে তাঁরা

  • আমার কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যম, সাহস ও মেধার পরিচয় দিয়ে সব সময় পাশে থেকেছেন।
  • তাঁদের আন্তরিক সহযোগিতা, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং কর্মপ্রেরণা আমার দায়িত্ব পালনে অসামান্য
  • ভূমিকা রেখেছে। এজন্য তাঁদের প্রত্যেককে আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

     

    চাকুরিজীবনে মাঠ পর্যায়ে আমি যাঁদের নিকট হতে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলাম, সেই বাগান

  • মালী হতে শুরু করে নৌকাচালক, বনপ্রহরী, ফরেস্টার, ডেপুটি রেঞ্জার, রেঞ্জার, সিনিয়র
  • রেঞ্জার, অতিরিক্ত সহকারী বন সংরক্ষক, (শেষোক্ত পদ দুটি বিলুপ্ত), সহকারী বন সংরক্ষক,
  • বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, বন সংরক্ষক, উপ-প্রধান বন সংরক্ষক, প্রধান বন সংরক্ষকতাদের
  • সবাইকেই জানাই ধন্যবাদ ও অভিনন্দন। এছাড়া, বন সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় যাঁদের অভিজ্ঞতা
  • ও জ্ঞান আমাকে সমৃদ্ধ করেছিল, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা। 

     

    গাড়ি চালানো শিখতে যেসব ড্রাইভার আমাকে সহায়তা করেছেন, তরঙ্গ-সংক্ষুব্ধ উপকূলীয়

  • নদী, খাড়ি ও তীরবর্তী সমুদ্রে স্পিডবোট চালানো শিখতে যেসব স্পিডবোটচালক সহযোগিতা করেছেন
  • এবং লঞ্চের সারেং, সুকানি ও মিস্ত্রিযাঁদের নিকট থেকে লঞ্চের ইঞ্জিন
  • সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছি এবং উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের সময় লঞ্চের স্টিয়ারিং ধরার সাহস
  • ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিতাঁদের সকলের প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বিশেষ কৃতজ্ঞতা
  • জানাই সুকানি আবুল হোসেনকে, যাঁর কাছ হতে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পেরেছিলাম।

     

    আর একজনের নিকট আমার কৃতজ্ঞতা রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আমার

  • শিক্ষক ছিলেন বিরল পাণ্ডিত্যের অধিকারী ড. ইবনে গোলাম সামাদ। আমার শিক্ষাজীবনে তিনি
  • বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।

     

    অফিসের যেসব হিসাবরক্ষক, অফিস সহকারী এবং প্রধান সহকারীর নিকট থেকে অফিসের হিসাব

  • পরিচালনা বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তাঁদের সবাইকে জানাই আমার কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।
  • অফিসের প্রহরায় নিযুক্ত কর্মীবৃন্দ, যাঁরা অফিস ও সরকারি সম্পদের নিরাপত্তা প্রদানের
  • মাধ্যমে আমার প্রশাসনিক কার্যক্রমে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের সবাইকে জানাই মোবারকবাদ।
  •  

    তাঁদের অভিজ্ঞতা আমাকে সঠিকভাবে আমার দায়িত্ব পালন করতে সহায়তা করেছে। তারই ফলশ্রুতিতে

  • বন বিভাগে কর্মরত থাকাকালীন কিছু অভিজ্ঞতা আজ এই ক্ষুদ্র পুস্তকের মাধ্যমে অন্যদের
  • সামনে উপস্থাপন করতে পারার সৌভাগ্য হয়েছে। এ জন্য আমি সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক
  • কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

     

  • পুস্তকটিতে অসাবধানতা বশত কিছু ভুলত্রুটি থেকে যেতে পারে। সেসব ভুলত্রুটির পাঠকগণের

  • কাছে আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। 

.... see more

Share:

বন সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে সহজ বিষয় বলে মনে হলেও বাস্তবিক পক্ষে ইহা অতি জটিল এক বিষয়। আমার এই সংক্ষিপ্ত ভূমিকায় জটিলতার বিষয়গুলিকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা সম্ভব হবে না। বন ও মনুষ্য বসতি দুটি ভিন্নমুখী বিষয়ই শুধু নয়, পরস্পর সাংঘর্ষিকও বটে। বনভূমিতে বসতি থাকবে না, বসতভূমিতে বন থাকবে না অথবা থাকতে পারবে না। মনুষ্য বসতি যতই অগ্রসর হতে থাকবে, বনভূমি ততই সংকুচিত হয়ে ক্রমান্বয়ে বহু দূরে চলে যাবে। ইহাই নিয়ম, ইহাই ঘটে আসছে সৃষ্টির আদিকাল থেকেই। বনকে যতই উপকারী বলে বনকর্মচারীরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে থাকুন না কেন— জনবসতির বিস্তারকে উপলক্ষ্য করে বনভূমি দখল করার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। এই প্রক্রিয়া এমন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যে, তা নিরন্তর ঘটে চলছে, ঘটতে থাকবে আবহমান কাল। তবে আমাদের দেশে প্রায় সর্ব ক্ষেত্রেই এটি প্রবল ও অতি বিকটভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।

 

আমাদের জনসংখ্যার অনুপাতে ভূমির পরিমাণ কম। বনভূমির আয়তনও কম। বনে উৎপাদিত দ্রব্যাদির চাহিদা মনুষ্য সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলেছে। বনভূমিতে উৎপাদিত দ্রব্য ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে সক্ষম নয়। 

 

তাছাড়া সামাজিক পর্যায়ে বন ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ কিংবা সমাজের অন্যান্য শ্রেণির মানুষের কাছে এখনো প্রথম শ্রেণির মর্যাদা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এদেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে বন ব্যবস্থাপনার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অচ্ছুতই রয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বনকর্মচারীরা বন সংরক্ষণে অবর্ণনীয় প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করছেন। এসব প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে বন ব্যবস্থাপনা সত্যিকার অর্থে একটি দূরূহ ও কষ্টসাধ্য প্রচেষ্টা।  এই বইয়ে এসব বিষয় সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরার প্রয়াস রয়েছে।

 

বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের সংকটের মূলে বনের প্রতি অবহেলা বেশ বড় ভূমিকা পালন করছে।

আমাদের প্রয়াস হচ্ছে—সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বন ও পরিবেশের প্রকৃত চিত্র সবার সামনে তুলে ধরা এবং সেই অনুযায়ী সবাইকে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করা।

 

বইটির নামকরণ নিয়ে দু-একটি কথা বলা প্রয়োজন। এ বিষয়ে অন্যদের মনে কিছুটা অস্পষ্ট ধারণা থাকতে পারে। বন ও বনভূমির শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করে একটি টেকসই বন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা বাস্তবিক অর্থে অত্যন্ত কঠিন। কারণ বন ধ্বংসের প্রক্রিয়া চারদিক থেকে বিভিন্ন কৌশলে চালানো হচ্ছে। পারিপার্শ্বিক শত্রুপরিবেষ্টিত অবস্থায় বন সংরক্ষণের প্রয়াস খরস্রোতা নদীতে উজান ঠেলে নৌকা বাওয়ার মতোই, বা তার চেয়ে অধিকতর কষ্টকর। এর জন্য চাই দুর্জয়, অদম্য মনোবল এবং হার না মানা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। বন ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ-সহ বনের সার্বিক বিষয় কতখানি প্রাসঙ্গিক ও যথাযথভাবে এই বইয়ে উপস্থাপন করতে পেরেছি, তা পাঠকগণ মূল্যায়ন করবেন। আমার সমগ্র কর্মজীবনে প্রতিকূলতা ছিল অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। এমন সব প্রতিকূলতা ও বিপর্যয়ের মধ্যে অগ্রসর হতে হয়েছে, যার পরিপূর্ণ বিবরণ সবিস্তারে উপস্থাপন করাও সমীচীন নয়। সেসব ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত পথ অবলম্বন করতে হয়েছে। আমাদের দেশের বন অতি দ্রুত হারে বিনষ্ট হয়েছে এবং হয়েই চলছে। কারণগুলোর ছিটেফোঁটা আলোচিত হয়েছে মাত্র। বলা হয়েছে সামান্যই। বলার বাইরে রয়ে গেছে যেসব ক্ষেত্র সেগুলো বলা সহজ নয়। আমার বিবেচনায় বনের সার্বিক অবস্থাকে ‘বন-বনানীর নীরবে নিভৃতে ক্রন্দন’ বলেই মনে হয়েছে।

 

সুন্দরবনে চাকুরিকালীন ৩টি হিংস্র মানুষ খেকো বাঘকে শিকার করতে হয়েছিল। সেই বাঘেরা ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল এবং সুন্দরবন অভ্যন্তরে ও সুন্দরবনের বাইরে প্রচুর মানুষ ও গবাদি পশু হত্যা করেছিল। তখনকার দিনে সুন্দরবনে ঘুম পাড়ানি বন্দুক (Tranquillizer gun)-এর ব্যবহার শুরু হয় নাই। তাই প্রচলিত বন্দুক দিয়ে শিকার করা ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। ১৯৭৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত সুন্দরবনের ব্যাঘ্রকুলকে বিপজ্জনক প্রাণী বলে বিবেচনা করা হতো। ঐ সময়ের পর হতে সকল বন্য প্রাণী হত্যা বা শিকারের ক্ষেত্রে আইনের মাধ্যমে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। তবে মানুষ খেকো বাঘের প্রাদুর্ভাব হলে কর্তৃপক্ষ সেই বাঘকে হত্যার আওতায় নিয়ে আসতেন। শীর্ষ কর্তৃপক্ষ কোনো বাঘকে মানুষ খেকো হিসেবে ঘোষণা করলে সেই বাঘকে শিকার করা বিধিসম্মত ছিল। এই বইয়ে মানুষ খেকো হিংস্র বাঘ শিকারের বাস্তব কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে, যা সাধারণের নিকট অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।

 

আমাদের দেশে যথেষ্ট পরিমাণ বন ও বনজ সম্পদ কখনই ছিল না। দুর্গম বরফে আচ্ছাদিত উঁচু বনভূমি-সমৃদ্ধ পাহাড় শ্রেণিও নাই। পাহাড় নামে যা আছে তা গারো পাহাড়, লুসাই ও খাসি পাহাড়ের পাদদেশের কিছু পাহাড় সদৃশ উঁচু টিলাভূমি, যেগুলোকে পাঠ্যপুস্তকে উঁচু পাহাড় শ্রেণি হিসেবে অভিহিত করা হয়নি।

 

চট্টগ্রামের কিয়দংশ, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটের উঁচু টিলাময় ভূখণ্ডই আমাদের পার্বত্য অঞ্চল। এক সময় দুর্গম মনে হলেও কালের পরিক্রমায় সকল পাহাড় ভূমি বর্তমানে মানুষের ব্যবহৃত ভূমিতে পরিণত হয়েছে। ফলে এককালের অনেক দুর্গম বনাঞ্চলও আজকের দিনে বৃক্ষশূন্য হয়ে গেছে। পাহাড়ি এলাকার পাশাপাশি দেশের মধ্যাঞ্চলে রয়েছে টিলাময় ভূমি। আরও আছে উপকূলীয় মানগ্রোভ বনভূমি।

 

সকল প্রকার বনভূমিই উপদ্রুত, অর্থাৎ মানুষের ব্যবহারকবলিত। বর্তমানে এসব বনভূমিতে রয়েছে বনের চিহ্নমাত্র, যা অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একদা এসব স্থানে গভীর বন-বনানী ছিল। বন ও বনভূমির ক্রমান্বয় অধোগতি অগ্রসরমাণ এবং তা অতি দ্রুত গতিতে।

 

সুন্দরবনে জলদস্যু ও ডাকাতি চলছে বহু কাল পূর্ব হতে। অনেক লেখক সুন্দরবনের জলদস্যুদের উপস্থিতিকে অনেক ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করতে ভালোবাসেন। সুন্দরবনকে তাঁরা চম্বল, অভিশপ্ত চম্বলের ডাকাত দলের সঙ্গে তুলনা করতে চান। ফুলন দেবী এবং অন্য দস্যুরা চম্বলে এক ভীতিপ্রদ অবস্থা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সেই বাস্তবতার সঙ্গে নানা অতিরঞ্জনও যুক্ত হয়েছিল। সেখানেও সাংবাদিকদের মস্তিষ্ক হতে অনেক কিছুই লিখিত হয়েছিল, যা সত্যি নয়। সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও কিছু ব্যক্তি ও মহল বিভিন্ন ঘটনাকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করে পরিস্থিতিকে বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে বন বিভাগের কর্মচারীদের মনোবল দুর্বল করে দেয়।

 

চম্বল আর সুন্দরবনের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। চম্বলের অভ্যন্তরে কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা পুলিশ পোস্ট ছিল না। কিন্তু সুন্দরবনের সর্বত্রই বনকর্মচারীদের অফিস আছে। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে থাকা সেসব অফিস হলো—টোল স্টেশন, টহল ফাঁড়ি (Patrol post), গেম স্যাংকচুয়ারি অফিস (Game Sanctuary Office) প্রভৃতি। এসব অফিসে সশস্ত্র বনকর্মচারী রয়েছে। 

 

এই অঞ্চলের মানুষের পেশা, ধর্ম, শিক্ষার মান ও তৎসম্বন্ধীয় সংস্কৃতির সম্মিলিত প্রভাব যেমন রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয়েছে, তেমনি প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও তার ছাপ স্পষ্ট। ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজ ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনায় শাসকদের রয়েছে এক প্রকার আত্মতুষ্টি বা আত্মম্ভরিতা, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত নয়। তবে দুঃখের বিষয় এই যে, এই দুর্বল ও ভিত্তিহীন পশ্চাৎপদতা কালের প্রবাহে বিলীন হওয়ার বদলে ক্রমান্বয়ে অধিকতর শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় বন ও বনজ সম্পদ ব্যবস্থপনায় বিভিন্ন অশুভ স্বার্থ জড়িয়ে পড়ায় টেকসই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এই বাধা ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে সামনে অগ্রসর হওয়াটাই প্রকৃত উজান স্রোতে নৌকা বাওয়া। তবে বাধাসমূহ উত্তুঙ্গ ও দুর্লঙ্ঘ্য। তাই বিপত্তিপূর্ণ উজান বাওয়া সহজসাধ্য নয়। সরকারি চাকরিজীবনের যে ঘটনাগুলো সাধারণের মাঝে প্রকাশ করা যায়, তারই যৎসামান্য অংশ এ বইয়ে স্থান পেয়েছে।

 

নানা ধরনের স্বার্থান্ধ মহলের ছোবল থেকে বন সংরক্ষণের কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত দুঃসাধ্য কাজ। চাকুরিজীবনে আমি দেখেছি, বৈধ উপায়ে হোক বা অবৈধ উপায়ে হোক —বন থেকে কিছু না কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা-পোষণকারী মানুষের সংখ্যা অগণিত। এদের অনেকেই সমাজে মতামত সৃষ্টিকারীও বটে। বন সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এদের বিরুদ্ধে লড়াই করে করে সামনে অগ্রসর হতে হয়েছে।

 

‘বন-বনানীর নীরবে নিভৃতে ক্রন্দন’ বইটিতে বাংলাদেশের বনভূমি ও বন ব্যবস্থাপনার অনেক অজানা, কৌতূহলোদ্দীপক ও রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির বর্ণনা আছে। বন সম্পর্কে সাধারণ ধারণার পাশাপাশি কিছু কিছু অপরিচিত ও অবিশ্বাস্য ঘটনার বর্ণনাও এই বইয়ে পাওয়া যাবে।

 

আমাদের মনে স্বাভাবিকভাবে কয়েকটি প্রশ্ন আসতে পারে। মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার এই বনভূমি ও মহিরুহগুলোও কি ভয়ে আতঙ্কিত হতে পারে? কুঠারের আঘাতে তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলে কি তাদের ক্রন্দন আসে? কুঠার বা করাতের আঘাতে তারা কি ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে? সুবিস্তৃত বনভূমি যখন তার অঙ্গ হারিয়ে সংক্ষিপ্ততর হয়ে উঠে তখন সে বনভূমি কি কান্না করতে পারে? মনে হয়— তাদের দেহ ছিন্ন হয়ে গেলে তারা ব্যথায় ডুকরে কেন্দে উঠে। কিন্তু সে কান্না কুঠার হাতে তস্কর বা বন্দুক হাতে শিকারির কানে পৌঁছায় না। রাতের অন্ধকারে চতুর্দিকে যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন, যখন সুনসান নীরবতা বিরাজ করে, ঠিক সেই সময়ে অসংখ্য বার সেই দুর্গম গভীর বনভূমির অভ্যন্তরে দাঁড়িয়ে মহিরুহসমূহের অন্তরের ভাষা কল্পনায় অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি। মনে হয়েছে— পরিষ্কার ভাষায় তারা তাদের আশঙ্কার কথা চুপি চুপি বলেছে যে, তাদেরও ভয় আছে। কোন সময়ে কোন দুর্বৃত্ত এসে তাদের গায়ে কুড়ালের কোপ বসাবে! কুড়ালের কোপে কোপে তার দেহ বিচ্ছিন্ন হতে থাকবে। তারা কাঁদবে, তাদের অব্যক্ত কান্না সারা বনে ছড়িয়ে পড়বে কিন্তু তা কুঠার চালানো তস্করের মনে কোনো অনুভূতির সঞ্চার করবে না। 

 

বন ও বনের বৃক্ষরাজির এ কান্না অব্যক্ত এবং তা সাধারণ মানুষের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না। তবে তাদের কান্না সারা বনভূমিতে ব্যাপ্ত হতে থাকে। এভাবে চলতে চলতে এক সময়ে সমগ্র বনভূমি বিরান হয়ে যায়। এই বেদনা প্রকৃতিপ্রেমীদের হৃদয়ে গভীর আহাজারি হয়ে ধরা দেয়; তাঁরা ব্যথিত হন, কখনো ডুকরে কেঁদেও ওঠেন। সত্যিই, প্রকৃতিপ্রেমীরা কাঁদেন। নীরব, নির্জন ও সুনসান বনভূমি যখন ক্ষত-বিক্ষত দেহ নিয়ে নীরবে কাঁদে, তখন তার সেই বেদনাভরা আহাজারি কেবল তাঁরাই শুনতে পায়, যাঁরা বনকে নিজের আপনজন বলে মনে করে।

 

বন রক্ষা কোনো সহজ বিষয় নয়। এ কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে যাঁরা নির্ভীকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন বা এখনো করে চলেছেন, সেই অকুতোভয় বনকর্মচারীদের কথা এই বই না পড়লে পুরোপুরি জানা যাবে না। এই বইয়ের কলেবর কিছুটা বড় হয়েছে। তবে বনের সমুদয় বিষয় জানার জন্য তা মোটেও যথেষ্ট নয়।

 

বনকে সত্যিকার অর্থে জানতে হলে একজন নিবেদিতপ্রাণ বনকর্মচারীর দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুভূতি নিয়ে জানতে হবে। যাঁরা কেবল ভ্রমণ, চিত্তবিনোদন বা স্বল্প সময়ের জন্য সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশে বনে যান, তারা সাধারণত বনের বহিরঙ্গের সামান্য অংশই দেখতে ও বুঝতে পারেন—অনেক সময় তা অসম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে সঠিক হয়। বনকে সম্পূর্ণভাবে জানতে পারেন তিনিই, যিনি নিজে বনজ সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকেন। বন ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত বনকর্মচারীরাই মূলত বন, বনভূমি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের গভীর আন্তঃসম্পর্কের বিষয়গুলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিবিড়ভাবে জানার সুযোগ পান।

 

চাকরিজীবনে বনবিদ্যায় ২ বছর শিক্ষাগ্রহণ এবং পরবর্তী ৩২ বছর বন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার সুবাদে বনজগতের অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গ—উভয় দিক সম্পর্কেই প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছি। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বন সংরক্ষণের গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে। দেশের সকলের কাছে বন ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি দরদি হবার আহ্বান জানিয়ে এই বইয়ের ভূমিকার সমাপ্তি করছি। 

বইয়ের বিস্তারিত তথ্য

Title বন-বনানীর নীরবে নিভৃতে ক্রন্দন
Author মোঃ গোলাম হাবিব
Publisher ত্রিনয়ন প্রকাশন
ISBN 978-984–29669-0-3
Edition 1st Published, July 2026
Number of Pages 816
Country Bangladesh
Language বাংলা